03.8
10

স্বর্গ হইতে বিদায় – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

by admin ·

ম্লান হয়ে এল কণ্ঠে মন্দারমালিকা ,

হে মহেন্দ্র , নির্বাপিত জ্যোতির্ময় টিকা

মলিন ললাটে । পুণ্যবল হল ক্ষীণ ,

আজি মোর স্বর্গ হতে বিদায়ের দিন ,

হে দেব , হে দেবীগণ । বর্ষ লক্ষশত

যাপন করেছি হর্ষে দেবতার মতো

দেবলোকে । আজি শেষ বিচ্ছেদের ক্ষণে

লেশমাত্র অশ্রুরেখা স্বর্গের নয়নে

দেখে যাব এই আশা ছিল । শোকহীন

হৃদিহীন সুখস্বর্গভূমি , উদাসীন

চেয়ে আছে । লক্ষ লক্ষ বর্ষ তার

চক্ষের পলক নহে ; অশ্বত্থশাখার

প্রান্ত হতে খসি গেলে জীর্ণতম পাতা

যতটুকু বাজে তার , ততটুকু ব্যথা

স্বর্গে নাহি লাগে , যবে মোরা শত শত

গৃহচ্যুত হতজ্যোতি নক্ষত্রের মতো

মুহূর্তে খসিয়া পড়ি দেবলোক হতে

ধরিত্রীর অন্তহীন জন্মমৃত্যুস্রোতে ।

সে বেদনা বাজিত যদ্যপি , বিরহের

ছায়ারেখা দিত দেখা , তবে স্বরগের

চিরজ্যোতি ম্লান হত মর্তের মতন

কোমল শিশিরবাষ্পে — নন্দনকানন

মর্মরিয়া উঠিত নিশ্বসি , মন্দাকিনী

কূলে কূলে গেয়ে যেত করুণ কাহিনী

কলকণ্ঠে , সন্ধ্যা আসি দিবা-অবসানে

নির্জন প্রান্তর-পারে দিগন্তের পানে

চলে যেত উদাসিনী , নিস্তব্ধ নিশীথ

ঝিল্লিমন্ত্রে শুনাইত বৈরাগ্যসংগীত

নক্ষত্রসভায় । মাঝে মাঝে সুরপুরে

নৃত্যপরা মেনকার কনকনূপুরে

তালভঙ্গ হত । হেলি উর্বশীর স্তনে

স্বর্ণবীণা থেকে থেকে যেন অন্যমনে

অকস্মাৎ ঝংকারিত কঠিন পীড়নে

নিদারুণ করুণ মূর্ছনা । দিত দেখা

দেবতার অশ্রুহীন চোখে জলরেখা

নিষ্কারণে । পতিপাশে বসি একাসনে

সহসা চাহিত শচী ইন্দ্রের নয়নে

যেন খুঁজি পিপাসার বারি । ধরা হতে

মাঝে মাঝে উচ্ছ্বসি আসিত বায়ুস্রোতে

ধরণীর সুদীর্ঘ নিশ্বাস — খসি ঝরি

পড়িত নন্দনবনে কুসুমমঞ্জরী ।

থাকো স্বর্গ হাস্যমুখে , করো সুধাপান

দেবগণ । স্বর্গ তোমাদেরি সুখস্থান —

মোরা পরবাসী । মর্তভূমি স্বর্গ নহে ,

সে যে মাতৃভূমি — তাই তার চক্ষে বহে

অশ্রুজলধারা , যদি দু দিনের পরে

কেহ তারে ছেড়ে যায় দু দণ্ডের তরে ।

যত ক্ষুদ্র , যত ক্ষীণ , যত অভাজন ,

যত পাপীতাপী , মেলি ব্যগ্র আলিঙ্গন

সবারে কোমল বক্ষে বাঁধিবারে চায় —

ধূলিমাখা তনুস্পর্শে হৃদয় জুড়ায়

জননীর । স্বর্গে তব বহুক অমৃত ,

মর্তে থাক্‌ সুখে দুঃখে অনন্তমিশ্রিত

প্রেমধারা — অশ্রুজলে চিরশ্যাম করি

ভূতলের স্বর্গখণ্ডগুলি ।

হে অপ্সরী ,

তোমার নয়নজ্যোতি প্রেমবেদনায়

কভু না হউক ম্লান — লইনু বিদায় ।

তুমি কারে কর না প্রার্থনা , কারো তরে

নাহি শোক । ধরাতলে দীনতম ঘরে

যদি জন্মে প্রেয়সী আমার , নদীতীরে

কোনো-এক গ্রামপ্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটিরে

অশ্বত্থছায়ায় , সে বালিকা বক্ষে তার

রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভাণ্ডার

আমারি লাগিয়া সযতনে । শিশুকালে

নদীকূলে শিবমূর্তি গড়িয়া সকালে

আমারে মাগিয়া লবে বর । সন্ধ্যা হলে

জ্বলন্ত প্রদীপখানি ভাসাইয়া জলে

শঙ্কিত কম্পিত বক্ষে চাহি একমনা

করিবে সে আপনার সৌভাগ্যগণনা

একাকী দাঁড়ায়ে ঘাটে । একদা সুক্ষণে

আসিবে আমার ঘরে সন্নত নয়নে

চন্দনচর্চিত ভালে রক্তপট্টাম্বরে ,

উৎসবের বাঁশরীসংগীতে । তার পরে

সুদিনে দুর্দিনে , কল্যাণকঙ্কণ করে ,

সীমন্তসীমায় মঙ্গলসিন্দূরবিন্দু ,

গৃহলক্ষ্মী দুঃখে সুখে , পূর্ণিমার ইন্দু

সংসারের সমুদ্রশিয়রে । দেবগণ ,

মাঝে মাঝে এই স্বর্গ হইবে স্মরণ

দূরস্বপ্নসম , যবে কোনো অর্ধরাতে

সহসা হেরিব জাগি নির্মল শয্যাতে

পড়েছে চন্দ্রের আলো , নিদ্রিতা প্রেয়সী

লুণ্ঠিত শিথিল বাহু , পড়িয়াছে খসি

গ্রন্থি শরমের — মৃদু সোহাগচুম্বনে

সচকিতে জাগি উঠি গাঢ় আলিঙ্গনে

লতাইবে বক্ষে মোর — দক্ষিণ অনিল

আনিবে ফুলের গন্ধ , জাগ্রত কোকিল

গাহিবে সুদূর শাখে ।

অয়ি দীনহীনা ,

অশ্রু-আঁখি দুঃখাতুর জননী মলিনা ,

অয়ি মর্ত্যভূমি । আজি বহুদিন পরে

কাঁদিয়া উঠেছে মোর চিত্ত তোর তরে ।

যেমনি বিদায়দুঃখে শুষ্ক দুই চোখ

অশ্রুতে পুরিল , অমনি এ স্বর্গলোক

অলস কল্পনাপ্রায় কোথায় মিলালো

ছায়াচ্ছবি । তব নীলাকাশ , তব আলো ,

তব জনপূর্ণ লোকালয় , সিন্ধুতীরে

সুদীর্ঘ বালুকাতট , নীল গিরিশিরে

শুভ্র হিমরেখা , তরুশ্রেণীর মাঝারে

নিঃশব্দ অরুণোদয় , শূন্য নদীপারে

অবনতমুখী সন্ধ্যা — বিন্দু-অশ্রুজলে

যত প্রতিবিম্ব যেন দর্পণের তলে

পড়েছে অসিয়া ।

হে জননী পুত্রহারা ,

শেষ বিচ্ছেদের দিনে যে শোকাশ্রুধারা

চক্ষু হতে ঝরি পড়ি তব মাতৃস্তন

করেছিল অভিষিক্ত , আজি এতক্ষণ

সে অশ্রু শুকায়ে গেছে । তবু জানি মনে

যখনি ফিরিব পুন তব নিকেতনে

তখনি দুখানি বাহু ধরিবে আমায় ,

বাজিবে মঙ্গলশঙ্খ , স্নেহের ছায়ায়

দুঃখে-সুখে-ভয়ে-ভরা প্রেমের সংসারে

তব গেহে , তব পুত্রকন্যার মাঝারে

আমারে লইবে চিরপরিচিতসম —

তার পরদিন হতে শিয়রেতে মম

সারাক্ষণ জাগি রবে কম্পমান প্রাণে ,

শঙ্কিত অন্তরে , ঊর্ধ্বে দেবতার পানে

মেলিয়া করুণ দৃষ্টি , চিন্তিত সদাই

যাহারে পেয়েছি তারে কখন হারাই ।

Related posts

Tags:

Leave a Reply